নানাবাড়ির দিনগুলো: শৈশবের স্বাধীনতা ও হারিয়ে যাওয়া আনন্দ
শৈশব মানেই কিছু বিশেষ জায়গা, কিছু বিশেষ মানুষ, আর কিছু অনুভূতি—যেগুলো সময়ের সাথে সাথে আরও গভীর হয়ে যায়। আমার জীবনে সেই জায়গাটার নাম নানাবাড়ি। আজ বড় হয়ে শহরের ব্যস্ত জীবনে দাঁড়িয়ে যখন পেছনে তাকাই, তখন বুঝি—নানাবাড়ির দিনগুলো শুধু স্মৃতি নয়, সেগুলোই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে স্বাধীন ও নির্ভেজাল সময়। এই লেখায় আমি তুলে ধরেছি আমার নানাবাড়ির গল্প, আমার নানু-নানির ভালোবাসা, নদী-পুকুর-মাঠে ঘেরা এক শৈশবের আবেগঘন দিনগুলো।
ভূমিকা
শৈশব মানেই কিছু বিশেষ জায়গা, কিছু বিশেষ মানুষ, আর কিছু অনুভূতি—যেগুলো সময়ের সাথে সাথে আরও গভীর হয়ে যায়। আমার জীবনে সেই জায়গাটার নাম নানাবাড়ি। আজ বড় হয়ে শহরের ব্যস্ত জীবনে দাঁড়িয়ে যখন পেছনে তাকাই, তখন বুঝি—নানাবাড়ির দিনগুলো শুধু স্মৃতি নয়, সেগুলোই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে স্বাধীন ও নির্ভেজাল সময়। এই লেখায় আমি তুলে ধরেছি আমার নানাবাড়ির গল্প, আমার নানু-নানির ভালোবাসা, নদী-পুকুর-মাঠে ঘেরা এক শৈশবের আবেগঘন দিনগুলো।
নানাবাড়ি মানেই স্বাধীনতা
ছোটবেলায় নানাবাড়িতে গেলেই মনে হতো—আমি যেন অন্য এক পৃথিবীতে এসে পড়েছি। এখানে কোনো কড়াকড়ি নেই, নেই পড়াশোনার চাপ, নেই সময়ের বাঁধন। নানাবাড়িতে আমার ছিল এক অঘোষিত স্বাধীনতা। যেকোনো গাছের ফল পেড়ে খেতে পারতাম, কেউ বকত না। আম, কাঁঠাল, পেয়ারা—সবকিছুতেই ছিল শৈশবের অধিকার।
পুকুর ছিল নানাবাড়ির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। দুপুরের রোদে পুকুরপাড়ে বসে পা ঝুলিয়ে দেওয়া, শাপলা পাতার ওপর হাত বুলানো, আর কাদামাখা পায়ে দৌড়াদৌড়ি—এসবই ছিল আমার দিনের বড় অংশ।
পুকুরে শেখা সাঁতার
আমি সাঁতার শিখেছি নানাবাড়ির বড় পুকুরে। প্রথম প্রথম ভয় লাগত, কিন্তু আমার মামা পাশে দাঁড়িয়ে সাহস দিতেন। তাঁর হাত ধরে পানিতে নামা, ধীরে ধীরে ছেড়ে দেওয়া—এইভাবেই পানির সাথে বন্ধুত্ব হয়। আজও যখন পানিতে নামি, সেই পুকুরের কথা মনে পড়ে যায়।
নানুর মাছ ধরার নেশা
আমার নানুর মাছ ধরার ছিল প্রবল শখ। প্রায়ই দেখা যেত, হাতে ছিপ নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েছেন। কখনো পুকুরে, কখনো নদীতে। আবার কখনো বড় জাল নিয়ে আসতেন, আর তখন পুরো বাড়িতে উৎসবের আমেজ তৈরি হতো।
সবচেয়ে মজার ছিল নদীতে মাছ ধরতে যাওয়া। আমাদের উঠানো হতো বড় ডিঙি নৌকায়। নৌকা চলত নদীর অনেক গভীরে। কখনো আবার কলাগাছের ভেলায় বসিয়ে রাখতেন আমাদের। নদীর মাঝখানে বসে চারপাশের জল আর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা—সেই অনুভূতি আজও ভোলার নয়।
ভয় আর আনন্দ একসাথে
বরশি টানলেই যখন পাঙাস বা টেংরা মাছ উঠত, তখন মাছগুলোর কোতকোত শব্দে আমি ভয় পেতাম। ছোট ছিলাম, তাই মাছগুলোকে আমার চোখে বিশাল দানবের মতো লাগত। কিন্তু সেই ভয়ের মাঝেই লুকিয়ে ছিল আনন্দ। আজ বুঝি, সেটাই ছিল জীবনের সবচেয়ে খাঁটি অনুভূতি।
নানির রান্না আর পারিবারিক মিলন
মাছ ধরা শেষ হলে আমরা সবাই ফিরে আসতাম বাড়িতে। মাছ তুলে দেওয়া হতো নানির হাতে। নানি কীভাবে যে রান্না করতেন! সেই স্বাদ আজও কোনো রেস্টুরেন্টে পাইনি। সবাই মিলে মাটিতে বসে খাওয়া, গল্প করা, হাসাহাসি—এই মুহূর্তগুলোই পরিবার মানে কী, তা আমাকে শিখিয়েছে।
মাঠ, ঘুড়ি আর ধান কাটা
খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে আমরা ছুটে যেতাম মাঠে। কখনো ঘুড়ি ওড়াতাম, কখনো ধান কাটা দেখতাম। কৃষকের ঘামে ভেজা মুখ, সোনালি ধানের ক্ষেত—এসবই আমার শৈশবের চিত্রপট।
উপসংহার
আজ আর সেই দিন নেই। নানাবাড়ি আছে, কিন্তু শৈশব নেই। তবুও স্মৃতিগুলো বেঁচে আছে মনের গভীরে। এই লেখাটা আসলে আমার মনের সত্যি কথা—আমার শিকড়ের কথা।
আমি নাসির।